শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের ধারাবাহিকতার ধাপ সমূহ

শিশুর বিকাশ

 

একজন শিশুপ পরির্পূণ মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার ভিত্তি হল প্রাকশৈশবকাল। গর্ভাবস্থা থেকে পাঁচ বছর বয়সের মধ্যেই পরিপূর্ণ বিকাশের ভিত্তি তৈরি হয়। 

শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যেমন প্রয়োজন খাবার তেমনি তার বিকাশের জন্য প্রয়োজন বাবা-মায়ের সঠিক যতœ ও ভালবাসা। জীবনের প্রথম বছরগুলেতে শিশুর শরীরের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে শিশু যা শেখে এবং যেভাবে শেখে তার উপরই গড়ে ওঠে তার বুদ্ধিমত্তা, ভাষার বিকাশ, সমাজিক ও আবেগের বিকাশ এবং ছোট-বড় মাংসপেশীর নিয়ন্ত্রন, চোখ ও হাতের সমন্বয়ের দক্ষতা। একারনেই শিশুর ধাপে ধাপে বেড়ে ওঠা ও বিকাশের জন্য তার জীবনের প্রথম তিনটি বছর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়ে থাকে।  শিশু জন্মের সময় সব দক্ষতা নিয়ে জন্মায় না বরং ধীরে ধীরে এবং ধাপে ধাপে তার সব দক্ষতা অজির্ত হয়। শিশুকে এই দক্ষতা অর্জনে সহায়তা করার জন্য যতœকারীরা (বাবা-মা ও বড়রা) শিশুর লালনপালনে গোছল, খাওয়োনো, ঘুম পাড়ানের সময় নানা ধরনের খেলা করেন ও মিষ্টি করে শিশুর সাথে ছড়া, গল্প ও কথা বলেন। এতে করে শিশুর ভাবের আদান-প্রদানে অভিব্যক্তি প্রকাশের সক্ষমতা বাড়ে। শিশু অন্যের কথা বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী সাড়া দিতে পারে। তবে সব শিশু এক নয়। প্রতিটি শিশুই অপর একটি শিশু থেকে আলাদা। শিশুরা নিজেদের মতো করে পৃথিবী দেখে, বড়দের মতো করে নয়।

শিশুরা বয়স অনুযায়ী ধাপে ধাপে যেভাবে বেড়ে ওঠে :-

·  জন্ম থেকে ৩ মাস বয়সী শিশুর বিকাশ
·        মা-বাবার আওয়াজ পেলেই হেসে উঠে। চোখ দিয়ে মাবাবার ঘোরা-ফেরা নজর রাখে । 
·        পেটের উপর উপুড় করে শুইয়ে দিলে মাথা তোলার চেষ্টা করে। মাথা একদিকে ফিরিয়ে চিত হয়ে শুতে পারে। 
·        নিজের হাত-আঙ্গুল নিয়ে খেলতে থাকে এবং হাত পা নাড়াচাড়া করতে পছন্দ করে। 

 

৪ থেকে ৬ মাস বয়সী শিশুর বিকাশ

  • ·        হাতের মুঠো বন্ধ করতে পারে। শিশুর তালুতে কিছু ছোঁয়ালে সেটা ধরার চেষ্টা করে। 
·        শিশুর ঘাড় শক্ত হয়, চিত থেকে উপুড় বা উপুড় থেকে চিত হতে পারে। 
·        পেছনে বালিশ বা হাত দিয়ে ঠেকা দিলে অল্প সময়ের জন্য বসতে পারে। উঁচু করে ধরলে পায়ে ভারও নিতে পারে। 
·        হাত দিয়ে খেলনা ধরতে চায়। সেগুলো এহাত থেকে ওহাত করে। দুইহাত একজায়গায় জড়ো করতে পারে।

 

৭ থেকে ১২ মাস বয়সী শিশুর বিকাশ

  • ·         হামাগুড়ি দেয়, ৯ মাসে সাহায্য ছাড়াই বসতে পারে। 

১২ মাস বয়সে দাঁড়াতে শিখে এবং হাটি হাটি পা পা করে এগুতে শিখে।

            আধো আধো করে মা-বাবা বলে, তিনটি শব্দ বলে । 

            আঙ্গুল দিয়ে জিনিস দেখায় এবং পছন্দ না হলে হাত থেকে ফেলে দেয়। 

         ১৩ থেকে ১৮ মাস বয়সী শিশুর বিকাশ

  •             একা একা হাঁটতে শিখে যায়। 
  •             হাতে গ্লাস  দিলে ধরে পানি খেতে পারে। 
  •             বাটি-চামচ, খেলনা ধরতে শিখে যায়। 
  •             আয়না দেখে নিজেকে চিনতে পারে। 
  •             নির্দেশ পালন করে যেমন- ওখানে যাও, ওটা আন। 
  •             কৌতুহল বাড়ে, নিজে কিছু করার চেষ্টা করে। 

        ২ বছর বয়সী শিশুর বিকাশ

  •             শিশু দৌড়াতে ও সিঁড়ি বেয়ে উঠতে পারে, বলে লাথি মারতে পারে। 
  •             তিন আঙ্গুলে ছোট ছোট জিনিস ধরতে পারে। যেমন-মুড়ি
  •             অর্থপূর্ণ দু’টি শব্দ একসাথে করে কথা বলতে পারে। যেমন-ভাত খাবো। 
  •             নির্দেশ পালনে সক্ষম হয়, বাথরুম পেলে বলতে ও বুঝাতে পারে। 
  •             চোখে চোখ রেখে সামাজিক ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ প্রকাশ করে, মনোযোগী হয়। 

        ৩ বছর বয়সী শিশুর বিকাশ

  •             নিজের তৈরি শব্দ দিয়ে প্রস্রাব-পায়খানার কথা বুঝায়। 
  •             নিজে নিজে পোশাক পরতে পারে, অন্যের সাহায্য নিতে চায় না।
  •             শিশু নিজের বুদ্ধি দিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চায়  (যেমন-চেয়ার টেনে সেটাতে উঠে দাঁড়িয়ে উপরে রাখা 

                     কোন কিছুর কাছে পৌঁছাতে চায়)। 

  •             বিভিন্ন ধরণের ছবি/বস্তু/খেলনা থেকে একই ধরনের জিনিস আলাদা করতে পাওে যেমন-ফুল, গরু ইত্যাদি।
  •             পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে খেলা করে। 
  •             সমবয়সীদের সাথে একসাথে খেলা করে ও সমবয়সী সাথীর প্রতি আগ্রহ বাড়ে। 
  •             পরিচিতি শিশুদেরকে ডাকে, কথা বলে ও তাদের সঙ্গে খেলে।
  •             যদি বকা দেয়া হয় তাহলে মন খারাপ হতে পারে। (শিশুকে বিষন্ন দেখাতে পারে যা মুখাবয়বে প্রকাশ পেতে পারে বা কাজ কর্মে মন খারাপের প্রকাশ দেখা যায়)
  •             অন্যের কথার প্রতি মনোযোগ দেয়।  
  •             ৩টি ছোট শব্দ দিয়ে একটি সম্পূর্ণ বাক্য তৈরি করতে পারে। (যেমন-বইটি টেবিলের উপর রাখ) 
  •             অনেক শব্দ শিখতে থাকে এবং চার শব্দের বাক্য তৈরি করতে শুরু করে।  
  •             কোন নতুন কিছু খলেই প্রশ্ন করতে শুরু করে।  
  •             পরিবারের অন্যান্য কাজের মধ্যে অংশগ্রহণ করে 
  •             লেখার মত অবস্থানে কলম বা পেন্সিল ধরতে পারে। 
  •             চক বা রং দিয়ে আঁকাআঁকি পছন্দ করে। গোলাকার চিহ্ন বা বৃত্ত আঁকতে এবং ক্রস চিহ্ন দিতে পারে।   
  •             রঙের নাম সঠিকভাবে বলতে পারে।
  •             কেউ তাড়া করুক অর্থাৎ ধরতে আসুক  এধরনের খেলা খলতে চায়। গড়িয়ে নিচে পড়তে এবং খেলার মাঠে
  •            দৌঁড়াদৌঁড়ি করতে পছন্দ করে। শিশু যখন দৌঁড়ায় তখন বল ছুঁড়ে মারতে পারে বা হাঁটে যখন তখন কোন কিছু খেলতে পারে।
  •             শরীর বৃত্তীয় খেলা, কল্পনাযুক্ত খেলা, ফাংশনাল খেলা ও আদান প্রদান মূলক খেলা খেলতে পছন্দ করে।

 

৪ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর বিকাশ

  •             কারও সাহায্য ছাড়া পোশাক পরতে পারে। আগের চেয়ে সুন্দরভাবে পোশাক পরতে, জুতার ফিতা বাঁধতে ও বোতলের মুখ লাগাতে পারে। কোন কিছু করতে গিয়ে অন্যের সাহায্য নিতে চায়না। 
  •             জটিল সমস্যার উপায় বের করে। 
  •             মৌলিক রংগুলো চিনতে পারে। সঠিকভাবে রং এর নাম বলতে পারে।
  •             ছবির ভুল ধরতে পারে।
  •             ৫ থেকে ১০টি বস্তু ‘ গুনতে পারে।
  •             অন্যেরা কি ভাবে, সে জন্য সে সচেতন হয়। 
  •             শিশু অনবরত কথা বলতে চায় এবং কোন কিছু সম্পর্কে ঘনঘন প্রশ œ করে। বকা দিলে মন খারাপ করে। 
  •             যা পছন্দ করে সেটা বড়দের বলতে চায় এবং দোকানে যেয়ে নিজে কিছু কিনতে চায়।
  •             এই সময়ে শিশুরা বিভিন্ন কায়দায় লাফ দিতে পারে, দুই পায়ে লাফ দিতে পারে, এক পায়ে দাঁড়াতে পারে। 
  •             সে বড় বল ছুঁড়তে ও ধরতে পারে। কেউ তাকে তাড়া করুক অর্থাৎ ধরতে আসুক এমন খেলা সে খেলতে  চায়।
  •             লেখার মতো অবস্থানে কলম বা পেন্সিল ধরতে পারে। বৃত্ত, চতুভূর্জ ও ত্রিভুজ আঁকতে পারে। 
  •             অন্যের চালচলন, কথাবার্তা র প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে  এবং তা অনুকরন করে। টিভি দেখে অনুকরণ করে।
  •             কথার মধ্য দিয়ে এবং ভাব প্রকাশের মাধ্যমে তার আনন্দদায়ক অনুভূতি প্রকাশ করে। 
  •             সে আগের ও বর্তমান চিন্তাধারণার মধ্যে তাড়াতাড়ি সম্পর্ক ¯া’ পন করতে পারে। 
  •             একটি বর্ণ বাক্য তৈরি করতে পারে এবং স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারে। 
  •             নিয়ম মানতে চায় না। 
  •             অন্য শিশুদের প্রতি ঝগড়াটে ভাব থাকে। আবার অন্যের দুঃখে সহানুভূতিশীল হয়। 
  • অন্য শিশুদের সাথে প্রতিযোগিতামূলক কাজে অংশ নেয়।  
  • কখনও কখনও হতাশাগ্রস্ত হয়।  
  • পরিবারের বিভিন্ন কাজে অংশগ্রহন করে।  
  • আনন্দ দেবার জন্য মজার বা হাসির কথা বলে কিন্তু তা হাসির হয় না। 
 

শিশুর টয়লেট ব্যবহার শেখা 

স্বাভাবিকভাবে সবাই খুশী হয় শিশু যখন নিজে নিজে টয়লেট ব্যবহার করে টয়লেট করতে শিখে যায়। শিশুরা ১৮ মাস বয়সের মধ্যেই টয়লেট ব্যবহার করা শিখে যায়, তবে অনেক শিশুর ৩ বছর বয়স পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। সাধারনত মেয়ে শিশুরা ছেলে শিশুদের তুলনায় টয়লেট ব্যবহার করতে তাড়াতাড়ি শেখে। শিশুর টয়লেট ব্যবহার এবং সময়মতো তা রপ্ত করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। শিশু শারীরিক, মানসিক ও অনুভূতিপূর্ণ সমর্থন পেলে নিজে নিজে প্রস্রাব-পায়খানার অভ্যাস রপ্ত করতে শিখবে। পরিবারের পত্যেক সদস্যই এ ব্যাপারে শিশুকে সহায়তা করবেন। শিশু যখন বসতে শেখে তখন থেকেই শিশুকে পটি’তে বসিয়ে প্রস্রাব-পায়খানা করানো হলে শিশু দ্রুত টয়লেট ব্যবহারে অভ্যস্ত হবে। কখন শিশু টয়লেট ব্যবহারের জন্য তৈরি হয়: 

শারীরিক যোগ্যতা 

  •  যখন শিশু হাঁটতে পারে, কথা বলতে পারে, নিজে নিজে প্যান্ট খুলতে পারে। 

মানসিক যোগ্যতা 

  • যখন সে বুঝতে পাওে প্রস্রাব বা পায়খানা পেয়েছে। আবার কিছু শব্দ যা শুনলে শিশু বুঝতে পারে যে তাকে প্র¯্রাব করতে বলা হচ্ছে। যেমন- হিসস.. পিশু ইত্যাদি। 
  • যখন সে বুঝতে পারে প্রস্রাব বা পায়খানার জন্য সে নিয়মিত কোথায় যাচ্ছে। প্রস্রাব বা পায়খানার জন্য নিয়মিত একই স্থানে ব্যবহার করা হলে সে প্রস্রাব বা পায়খানার জন্য কোথায় যাবে এবং কি করবে শিখে যায়।  
শিশুকে টয়লেট ব্যবহার ও টয়লেট ট্রেনিং দেয়ার ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে: 
১। গভীর গর্ত, জোরে ফ্লাশের শব্দ বা পানি পড়ার শব্দ বা অন্ধকার টয়লেট শিশুর মনে ভয়ের সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে শিশু টয়লেটে গিয়ে প্রস্রাব বা পায়খানা করতে চাইবে না।  
২। শিশুর টয়লেট প্র্যাকটিসের সময় তদারকি করুন। শিশুকে কখনো লজ্জা দিবেন না। শিশু সফলভাবে টয়লেট করতে পারলে তার প্রশংসা করুন। 
৩। টয়লেট নোংরা, স্যাঁত-স্যাঁতে, পিছল করে রাখবেন না। শিশুরা ভেজা বা স্যতস্যেতে টয়লেট পছন্দ করে না। আবার যে কোন সময় শিশুটি দূর্ঘটনায় পরতে পারে। 
সময় নিয়ে ধীরে ধীরে শিশুকে টয়লেট ট্রেনিং দিন। টয়লেট ব্যবহার 
করে শিশুকে টয়লেট করতে অভ্যস্ত করে তুলুন।। 


Comments

Popular posts from this blog

বুদ্ধি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষণ কৌশল

শিশুর এ্যাসেসমেন্ট প্রক্রিয়া যা জানা এবং বোঝা জরুরী।

প্রতিবন্ধীদের একীভূত শিক্ষায় বাধাসমূহ ও এর সমাধান